
মো. মামুন চৌধুরী ॥ এ মৌসুমে হবিগঞ্জের হাওরগুলোতে কিছুটা আগেই পানি এসেছে। বৈশাখ মাস থেকেই টানা বৃষ্টিপাতে জেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল পানিতে ভরে ওঠে। কিন্তু পানি থাকলেও মিলছে না একসময়কার পরিচিত দেশীয় প্রজাতির মাছ। নিষিদ্ধ রিং জাল, চায়না দুয়ারি ও কারেন্ট জালের অবাধ ব্যবহারে দেশীয় মাছের অস্তিত্ব আজ সংকটের মুখে।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন হাওর ঘুরে এবং স্থানীয় বাসিন্দা, জেলে ও মাছ বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলার ৯টি উপজেলার প্রায় সব হাওরেই দেশীয় মাছের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। বিশেষ করে ভাটি অঞ্চল হিসেবে পরিচিত বানিয়াচং, লাখাই, আজমিরীগঞ্জ ও নবীগঞ্জ উপজেলার হাওরগুলোতে আগের মতো শোল, গজার, টেংরা, পাবদা, কৈ, বোয়াল, আইড়, মাগুর, শিং, পুঁটি, বাইম, চিংড়ি, বাইলা ও নানি মাছ এখন খুব কমই পাওয়া যায়। ফলে স্থানীয় বাজারেও দেশীয় মাছের সরবরাহ কমেছে, বেড়েছে দাম।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হাওরজুড়ে এখন নির্বিচারে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল, রিং জাল ও চায়না দুয়ারি। এসব জালে বড় মাছের পাশাপাশি ছোট পোনা, ডিমওয়ালা মা-মাছ, এমনকি মাছের ডিমও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। শুধু মাছ নয়, কাঁকড়া, ব্যাঙ, বিভিন্ন উপকারী পোকামাকড়সহ অসংখ্য জলজ প্রাণীও এসব জালে আটকা পড়ে মারা যাচ্ছে। এতে হাওরের প্রাকৃতিক খাদ্যচক্র ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পরিবেশবিদদের মতে, জলজ প্রাণীর সংখ্যা কমে গেলে পুরো হাওরবাস্তুতন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ব্যাঙ ও ক্ষুদ্র জলজ প্রাণী কমে গেলে কীটপতঙ্গের বিস্তার বাড়তে পারে, যা কৃষিতেও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে শুধু নিষিদ্ধ জালই নয়, হেমন্ত মৌসুমে পানি কমে গেলে অনেক স্থানে মাছ ধরতে বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে পানিতে থাকা মাছের ডিম ও অন্যান্য জলজ প্রাণী ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে এবং বছর বছর দেশীয় মাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।
বানিয়াচং উপজেলার শতমুখা গ্রামের বাসিন্দা মাহবুবুর রহমান চৌধুরী বলেন, আগে আষাঢ় মাসে নতুন পানি এলেই নানা ধরনের দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। এসব মাছের স্বাদ ছিল অতুলনীয়। এখন প্রত্যন্ত এলাকাতেও দেশীয় মাছ তেমন পাওয়া যায় না। যেগুলো পাওয়া যায়, সেগুলোর দামও অনেক বেশি। প্রায় সব বাজারেই এখন চাষের মাছের আধিক্য। মা-মাছ ও পোনা নিধনের কারণেই মাছের সংখ্যা বাড়ছে না। ছোট মাছ ধরে ফেলায় বড় হওয়ার সুযোগই পাচ্ছে না।
লাখাই উপজেলার স্বজনগ্রামের বাসিন্দা রফিক উদ্দিন বলেন, একসময় বর্ষা মৌসুমে হাওরে প্রচুর দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। এখন সেই চিত্র নেই। পুরো হাওরজুড়ে নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার হচ্ছে। এসব জালে অতি ক্ষুদ্র পোনা থেকে শুরু করে উপকারী পোকামাকড় পর্যন্ত আটকা পড়ে। এভাবে চলতে থাকলে একসময় দেশীয় মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
আজমিরীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা এনামুল হক বলেন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মৎস্য অফিস থাকলেও তাদের কার্যক্রম চোখে পড়ে না। মাঝে মধ্যে লোক দেখানো অভিযান চালানো হয়, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতেও কার্যকর কোনো পরিকল্পনা দেখা যায় না।
মৎস্য বিক্রেতা রাজেশ দাসের ভাষায়, আমরা কী করব? হাওরে গিয়ে মাছই পাই না। যা পাই, তাই ধরে এনে বিক্রি করে সংসার চালাই। আগে জাল নিয়ে হাওরে গেলেই মাছ পাওয়া যেত। এখন সারাদিন ঘুরেও তেমন মাছ মেলে না।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। নিষিদ্ধ জালের উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে মা-মাছ ও পোনা সংরক্ষণ, প্রজনন মৌসুমে কঠোর নজরদারি, জলাশয়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
হাওরবাসীর আশঙ্কা, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে হবিগঞ্জের হাওর থেকে দেশীয় বহু প্রজাতির মাছ হারিয়ে যাবে। সেই সঙ্গে হুমকির মুখে পড়বে হাওরের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য, যা শুধু পরিবেশ নয়, স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শরীফুল আলম বলেন, নিষিদ্ধ জাল বিক্রি ও ব্যবহার বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে শহরের চৌধুরী বাজারে দুই দফা অভিযান চালিয়ে প্রায় পাঁচ টন নিষিদ্ধ জাল জব্দ করা হয়েছে। পরে সেগুলো পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। এ ছাড়া ডিমওয়ালা ও পোনা মাছ নিধন ঠেকাতে জেলাজুড়ে নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
তিনি বলেন, এসব জাল হাওরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এতে অতি ক্ষুদ্র মাছ থেকে শুরু করে হাওরের উপকারী পোকামাকড়ও আটকা পড়ে মারা যায়। ফলে শুধু মাছের ক্ষতিই নয়, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই এসব জালের বিস্তার রোধে সর্বোচ্চ নজরদারি রাখা হচ্ছে।
আরও পড়ুন- শায়েস্তাগঞ্জ হাসপাতালে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে বাড়ছে সৌন্দর্য







One Comment