
মো. মামুন চৌধুরী ॥ হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে জংশনের ব্যস্ত প্লাটফর্মে প্রতিদিন হাজারো মানুষের পদচারণা। ট্রেন আসে, ট্রেন যায়-মানুষের জীবনের ব্যস্ততা থেমে থাকে না।
কিন্তু এই কোলাহলের মাঝেই এক কোণে নীরবে পড়ে আছে এক মানবিক অসহায় বানেছা বেগমের জীবনসংগ্রামের গল্প। কয়েক বছর আগেও স্বামী মটাই মিয়াকে নিয়ে ছোট্ট হলেও একটি সংসার ছিল তার।
স্বামী ভিক্ষা করে যা আয় করতেন, তা দিয়েই কোনোভাবে চলত দু’জনের জীবন। রেলওয়ে বস্তির একটি ভাড়া ঘরেই ছিল তাদের আশ্রয়। অভাব ছিল, কষ্ট ছিল-তবুও ছিল একে অপরের পাশে থাকার ভরসা।
কিন্তু সেই ভরসাটুকুও হারিয়ে যায়, যখন মটাই মিয়া মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর যেন হঠাৎ করেই সবকিছু ভেঙে পড়ে বানেছা বেগমের জীবনে। আয়-রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে যায়, আর্থিক সংকটে পড়ে ছেড়ে দিতে হয় সেই ভাড়া ঘরটিও।
এরপর থেকে শুরু হয় তার খোলা আকাশের নিচে বেঁচে থাকার নির্মম বাস্তবতা। বর্তমানে শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে জংশনের প্লাটফর্মই তার একমাত্র আশ্রয়। সেখানেই দিন কাটে, সেখানেই রাত।
কোনো বিছানা নেই, নেই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। কখনো প্লাটফর্মের বেঞ্চে, কখনো মেঝেতে-এভাবেই কেটে যায় তার দিন-রাত। জীবিকা নির্বাহের জন্য এখন তাকেও বেছে নিতে হয়েছে ভিক্ষাবৃত্তি। প্রতিদিন মানুষের কাছে হাত পেতে যা পান, তা দিয়েই কোনোমতে জোগাড় করেন একবেলা বা দু’বেলা খাবার।
কিন্তু সেই আয় এতটাই অপ্রতুল যে নিজের ন্যূনতম চাহিদাগুলোও পূরণ করতে পারেন না তিনি। বানেছা বেগমের শরীরে জড়ানো কাপড়গুলোই তার দুঃখ-দুর্দশার নীরব সাক্ষী। দীর্ঘদিন ধরে নতুন কাপড় কিনতে পারেননি। ছেঁড়া, মলিন কাপড় পরেই তাকে দিন কাটাতে হচ্ছে।
শীতের কনকনে ঠান্ডা, গরমের তীব্র দাবদাহ কিংবা বর্ষার বৃষ্টিতেও তার নেই কোনো আলাদা আশ্রয় বা সুরক্ষা। শারীরিকভাবে অসুস্থ হলেও চিকিৎসা নেওয়ার কোনো সামর্থ্য নেই তার। কোনো ওষুধ কেনার টাকা নেই, নেই দেখভাল করার মতো কোনো স্বজনও। নিঃসঙ্গতা আর অভাব যেন তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, প্রতিদিনই প্লাটফর্মে তাকে দেখা যায়। অনেকেই সামান্য সাহায্য করেন, কেউ খাবার দেন, কেউ বা কিছু টাকা। কিন্তু এই সহায়তা সাময়িক-স্থায়ী কোনো সমাধান নেই তার জীবনে। মানবিক এই করুণ চিত্র সমাজের বিবেককে নাড়া দেয়।
সচেতন মহল মনে করেন, প্রশাসন ও সমাজের বিত্তবান মানুষের সামান্য উদ্যোগই বদলে দিতে পারে বানেছা বেগমের জীবন। একটি নিরাপদ আশ্রয়, কিছু নিয়মিত সহায়তা-এতেই হয়তো ফিরে পেতে পারেন তিনি বেঁচে থাকার ন্যূনতম সম্মান ও স্বস্তি।
অসহায় এই নারী আজ সমাজের সহানুভূতির প্রত্যাশায়। তার দিকে বাড়ানো একটি সহায়তার হাতই হতে পারে তার নতুন করে বাঁচার আশার আলো। বানেছা বেগম বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে তিনি একেবারে অসহায় হয়ে পড়েছেন।
এক বেলা খেলে অন্য সময় উপোষ থাকতে হয়। সংশ্লিষ্টদের কাছে আর্থিক সহায়তা কামনা করেন। স্থানীয় বাসিন্দা শরীফ মিয়া, সুজন মিয়া, আব্দুর রহিম মিয়া বলেন, তার স্বামী নেই। নেই ঘরবাড়ি। সন্তান নেই।
ওই নারী বড় অসহায়। তাকে সরকারিভাবে আর্থিক সহায়তা করা হোক। জংশনে স্টেশন মাস্টার লিটন চন্দ্র দে বলেন, এখানে অনেক অসহায় লোকজন বসবাস করে। তারা নানা কর্ম করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। অসহায় বানেছা বেগমের শারীরিক অবস্থা ভালো নয়। সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহবান তার পাশে থাকার জন্য।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাকিফ ইশমাম চৌধুরীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বানেছা বেগমের ব্যাপারে খোঁজ খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা করার চেষ্টা করা হবে।






