
মো. মামুন চৌধুরী ॥ অভাব যেন মেধাবী শিক্ষার্থী নিরব রায়ের স্বপ্নের পথে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ থাকলেও পরিবারের সীমিত আয়ের কারণে একের পর এক বাধা তৈরি হচ্ছিল। পরীক্ষা ফি ও মাসিক বেতন পরিশোধ করতে না পারায় দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী নিরব রায়ের শিক্ষাজীবন একসময় অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। কিন্তু ঠিক সেই সময় তার পাশে দাঁড়িয়েছেন মানবিক হৃদয়ের অধিকারী ফ্রান্স প্রবাসী ক্রীড়া সংগঠক ও সমাজসেবক বদরুল আলম তালুকদার।
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার পূর্ব বড়চর গ্রামের কাজল রায়ের ছেলে নিরব রায়। মেধাবী এই শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটের মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে আসছিল। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত হওয়ায় নিয়মিত শিক্ষা ব্যয় বহন করা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছিল। এমন পরিস্থিতিতে পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয় তার।
নিরবের এই সংকটের কথা জানতে পেরে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন ফ্রান্স প্রবাসী বদরুল আলম তালুকদার। তিনি নিরবের শিক্ষাজীবন নির্বিঘœ রাখতে তার শিক্ষাব্যয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আওতায় পরীক্ষা ফি ও নিয়মিত মাসিক বেতনসহ প্রয়োজনীয় শিক্ষা ব্যয়ে সহযোগিতা করা হচ্ছে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নিরব রায়ের হাতে বদরুল আলম তালুকদারের পক্ষ থেকে আর্থিক অনুদান তুলে দেওয়া হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন নিরবের বাবা কাজল রায়। অনুদান হাতে পেয়ে নিরবের চোখেমুখে ফুটে ওঠে স্বস্তি ও নতুন স্বপ্নের ছাপ।
নিরব রায় আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জানায়, “এই সহযোগিতা না পেলে হয়তো আমার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যেত। এখন আমি নতুন করে স্বপ্ন দেখতে পারছি। আমি মন দিয়ে পড়াশোনা করে ভবিষ্যতে ভালো কিছু করতে চাই।”
ছেলের পড়াশোনা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকা বাবা কাজল রায়ের কাছেও এটি যেন স্বস্তির খবর। সীমিত আয়ের সংসারে সন্তানের শিক্ষা ব্যয় বহন করা যখন কঠিন হয়ে পড়েছিল, তখন একজন প্রবাসীর এমন সহযোগিতা তাদের পরিবারকে নতুন সাহস দিয়েছে।
শুধু একবারের আর্থিক সহায়তা দিয়েই থেমে থাকেননি বদরুল আলম তালুকদার। নিরবের পড়াশোনা যাতে ভবিষ্যতেও বাধাগ্রস্ত না হয়, সে জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী সার্বিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। ফলে আর্থিক সংকটের কারণে শিক্ষাজীবন থমকে যাওয়ার যে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই কেটে গেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একটি শিশুর হাতে অর্থ তুলে দেওয়া হয়তো স্বল্পমেয়াদি সহায়তা; কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়া মানে তার ভবিষ্যৎ গড়ার পথকে শক্তিশালী করা। বদরুল আলম তালুকদারের এই উদ্যোগ তাই শুধু একটি পরিবারের পাশে দাঁড়ানো নয়, বরং একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার মানবিক প্রয়াস।
স্থানীয় এলাকাবাসী ও সচেতন মহল তার এমন উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। তাদের মতে, সমাজের বিত্তবান ও প্রবাসীরা যদি অসচ্ছল কিন্তু মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ান, তাহলে অর্থের অভাবে অনেক শিক্ষার্থীর ঝরে পড়া রোধ করা সম্ভব। পাশাপাশি এ ধরনের মানবিক উদ্যোগ সমাজের অন্যদেরও শিক্ষা ও মানবকল্যাণমূলক কাজে এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করবে।
জীবনের শুরুতেই আর্থিক সংকটের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল নিরব। তবে একজন মানবিক মানুষের সহযোগিতায় সেই অন্ধকারের মাঝেই এখন জ্বলে উঠেছে আশার আলো। নিরবের স্বপ্ন-পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়ানো এবং একদিন সমাজের জন্য কিছু করা।
আর সেই স্বপ্নের পথে পাশে দাঁড়ানো বদরুল আলম তালুকদারের এই উদ্যোগ হয়তো নিরবের জীবনের গল্পে শুধু একটি সহায়তার ঘটনা হয়ে থাকবে না; বরং হয়ে থাকবে ‘অভাবের কাছে মেধা হার মানে না’-এই বিশ্বাসের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।







One Comment