
মো. মামুন চৌধুরী ॥ টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট সাম্প্রতিক বন্যায় হবিগঞ্জ জেলায় জনজীবনের পাশাপাশি কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে নেমে এসেছে ব্যাপক বিপর্যয়। প্রাথমিক হিসাবে তিনটি খাতে শত কোটিরও বেশি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বন্যার পানি পুরোপুরি নেমে গেলে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ হতে পারে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৯টি উপজেলায় বন্যাকবলিত হয়েছেন ৬ হাজার ৬৪৫টি পরিবারের ৩০ হাজার ১৪০ জন মানুষ। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে। দুর্গতদের সহায়তায় ইতোমধ্যে ২ হাজার ৬৮২ প্যাকেট শুকনা খাবার, ৩০ মেট্রিক টন চাল এবং ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় নৌকার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৯ উপজেলায় আবাদ করা ৪১ হাজার ২০ হেক্টর আউশ ধানের মধ্যে ১ হাজার ২৫৯ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ৬৫০ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজির মধ্যে ২৩৩ হেক্টর এবং ৬৮৫ হেক্টর আমনের বীজতলার মধ্যে ১৫০ হেক্টর সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে। সব মিলিয়ে ৪২ হাজার ৩৫৫ হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে ১ হাজার ৬৪২ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ১ হাজার ২০০ কৃষকের প্রায় ৫ কোটি ৫২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) দ্বীপ কুমার পাল জানান, এটি প্রাথমিক হিসাব। পানি নেমে গেলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে।
অন্যদিকে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে মৎস্য খাতে। জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, হবিগঞ্জ সদর, বাহুবল ও মাধবপুর উপজেলায় অন্তত ১ হাজার ১০০টি মাছের খামার ও ব্যক্তিগত পুকুর প্লাবিত হয়েছে। এতে বিপুল পরিমাণ মাছ ভেসে যাওয়ায় প্রায় ৯৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
গত অর্থবছরে জেলায় উন্মুক্ত জলাশয় থেকে প্রায় ৩৫ হাজার টন এবং ব্যক্তিগত খামার থেকে প্রায় ২৩ হাজার টন মাছ উৎপাদিত হয়েছিল। চলতি অর্থবছরেও একই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও এক হাজারের বেশি খামার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দেওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শরীফুল আলম বলেন, বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যক্তিগত মাছের খামার। অনেক খামারের মাছ সম্পূর্ণ ভেসে গেছে। ফলে চলতি অর্থবছরে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।
বন্যার প্রভাব পড়েছে প্রাণিসম্পদ খাতেও। জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০০ টন দুধ ও ১০ লাখ ডিম উৎপাদিত হলেও বন্যার কারণে দৈনিক দুধ উৎপাদন ২৫ টন এবং ডিম উৎপাদন ৯০ হাজার পিস কমে গেছে।

এছাড়া প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক টন গোখাদ্য (খড়) নষ্ট হওয়ায় প্রায় ১০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। দুধ ও ডিম উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় আরও প্রায় ২ কোটি টাকার ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব পাওয়া গেছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নূরুল ইসলাম বলেন, বন্যায় প্রাণিজ আমিষ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্য বছর জেলার চাহিদা পূরণ করে ডিম, দুধ ও মাংস দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হলেও এবার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে। এমনকি জেলার নিজস্ব চাহিদা পূরণ করতেও কিছুটা সংকট দেখা দিতে পারে।
গত বৃহস্পতিবার রাতে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদের বাঁধ ভেঙে ঢলের পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে। এক রাতের মধ্যেই প্রায় ৬ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। একই সময়ে বানিয়াচং উপজেলার মক্রমপুর এলাকায় বাঁধ ভেঙে তিন উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্ষয়ক্ষতির সঠিক চিত্র নিরূপণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, মৎস্যচাষি ও খামারিদের পুনর্বাসনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করলে জেলার কৃষি ও প্রাণিজ উৎপাদন খাত দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়তে পারে।
আরও পড়ুন- হবিগঞ্জে বিজিবির ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পে ড্রোনে ত্রাণ বিতরণ







One Comment