মো. মামুন চৌধুরী ॥ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যে ভরপুর জেলা হবিগঞ্জ। ৯ উপজেলা নিয়ে গঠিত এ জেলার একদিকে বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল, অন্যদিকে পাহাড়ি টিলা, নদ-নদী, গ্রাম-শহর ও শিল্পাঞ্চলের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে ব্যতিক্রমধর্মী ভূপ্রকৃতি। বছরের বিভিন্ন সময়ে প্রকৃতির ভিন্ন রূপ দেখা গেলেও বৈশাখের এই সময়টিতে সাধারণত হাওরাঞ্চলে থাকে উৎসবের আমেজ। কৃষকরা সোনালি ধান ঘরে তোলার আনন্দে মেতে ওঠেন। গ্রামজুড়ে চলে নতুন ধানের ঘ্রাণ, পিঠাপুলির আয়োজন আর আত্মীয়-স্বজনের আনাগোনা।
কিন্তু এবারের দৃশ্য একেবারেই ভিন্ন। টানা ভারী বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। বিশেষ করে আজমিরীগঞ্জ, বানিয়াচং, লাখাই, নবীগঞ্জ ও বাহুবল উপজেলার হাওরাঞ্চলের অধিকাংশ বোরো ক্ষেত পানির নিচে চলে গেছে। ধান কাটার শেষ সময়ে এসে এমন দুর্যোগে কৃষকদের বুকভরা স্বপ্ন মুহূর্তেই ধ্বংস হয়ে গেছে।
কৃষকদের ভাষ্য, আর মাত্র কয়েকদিন সময় পেলেই তারা ধান ঘরে তুলতে পারতেন। অনেকেই প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ধান কাটতে সক্ষম হলেও বাকিগুলো পানির নিচে তলিয়ে গেছে। আবার অনেকে এখনো ধান কাটাই শুরু করতে পারেননি। ফলে এক মৌসুমের একমাত্র ফসল হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন হাজার হাজার কৃষক পরিবার।
হাওরপাড়ের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অধিকাংশ কৃষক ধার-দেনা করে কিংবা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে বোরো আবাদ করেছিলেন। কেউ জমি বন্ধক রেখে বীজ, সার ও কীটনাশক কিনেছেন। কিন্তু আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢল তাদের সব হিসাব এলোমেলো করে দিয়েছে।
বানিয়াচং উপজেলার কৃষক রাজু মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “সারাবছর এই ফসলের দিকেই তাকিয়ে থাকি। দিন-রাত কষ্ট করে ধান ফলাই। আর কয়েকদিন সময় পেলে সব ধান ঘরে তুলতে পারতাম। এখন চোখের সামনে সব পানির নিচে। পরিবার নিয়ে কীভাবে চলবো বুঝতে পারছি না।”
আজমিরীগঞ্জের আরেক কৃষক সমুজ মিয়া বলেন, “এবার ফলন খুব ভালো হয়েছিল। মনে আশা ছিল ঋণ শোধ করে কিছু টাকা হাতে থাকবে। কিন্তু পাহাড়ি ঢল সব শেষ করে দিল।”
শুধু কৃষকই নয়, ক্ষতির মুখে পড়েছেন হাওরাঞ্চলের দিনমজুর ও শ্রমজীবী মানুষও। ধান কাটার মৌসুমকে কেন্দ্র করে যারা কয়েক মাস কাজের আশায় ছিলেন, তারাও এখন কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। ফলে হাওরজুড়ে নেমে এসেছে হতাশা ও দুর্ভোগ।
এদিকে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে জেলার নদ-নদীতে পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পায়। পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ বালু ভেসে আসছে বিভিন্ন নদী ও খালে। এতে কোটি কোটি টাকার বালুর মজুদ তৈরি হওয়ায় সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছেন বালু ব্যবসায়ীরা।
নদীর বিভিন্ন ঘাটে এখন বাড়তি উৎসাহে বালু উত্তোলন ও মজুদের প্রস্তুতি নিতে দেখা গেছে ব্যবসায়ীদের। স্থানীয়রা জানান, বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে উন্নতমানের বালু নেমে আসে। এতে ব্যবসায়ীরা কম খরচে বেশি বালু সংগ্রহ করতে পারেন। ফলে কৃষকের কান্নার মধ্যেও বালু ঘাটগুলোতে দেখা যাচ্ছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বালু ব্যবসায়ী বলেন, “পাহাড়ি ঢলের সময় নদীতে প্রচুর বালু আসে। এতে ব্যবসা ভালো হয়। এবারও নদীতে অনেক বালু এসেছে।” অন্যদিকে এ বৃষ্টি আশীর্বাদ হয়ে এসেছে জেলার চা শিল্পে। জেলার চুনারুঘাট, নবীগঞ্জ, মাধবপুর ও বাহুবলের চা বাগানগুলোতে বৃষ্টির কারণে নতুন কুঁড়ি উৎপাদন বেড়েছে। চা বাগান সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ সময়ের খরার পর এমন বৃষ্টি চা গাছের জন্য খুবই উপকারী। এতে উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি চায়ের গুণগত মানও ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চা বাগানের এক কর্মকর্তা জানান, “চা গাছের জন্য পর্যাপ্ত বৃষ্টি প্রয়োজন। এবার বৃষ্টির কারণে নতুন কুঁড়ি দ্রুত বের হচ্ছে। উৎপাদনও বাড়বে বলে আশা করছি।” প্রকৃতির এই বৈপরীত্য যেন আবারও স্মরণ করিয়ে দিল-একই বৃষ্টি কারো জন্য আশীর্বাদ, আবার কারো জন্য অভিশাপ। হাওরের কৃষকের চোখে যেখানে হতাশা ও অশ্রু, সেখানে বালু ব্যবসায়ী ও চা শিল্পে দেখা যাচ্ছে স্বস্তি ও আনন্দের ছাপ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিবছর আগাম বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে হাওরের কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতি হলেও এখনো স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত হয়নি। হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে দীর্ঘসূত্রতা, সময়মতো ধান কাটার আধুনিক ব্যবস্থা না থাকা এবং দুর্যোগ মোকাবেলায় কার্যকর পরিকল্পনার অভাবে কৃষকদের বারবার ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
সচেতন মহলের দাবি, হাওরাঞ্চলের কৃষকদের রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা জোরদার, আধুনিক হারভেস্টার বাড়ানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে নদী ও বালু ব্যবস্থাপনাতেও সুষ্ঠু নীতিমালা প্রণয়ন প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা। প্রকৃতির নির্মম খেলায় এবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এক বাস্তবতা-কারো সর্বনাশই আবার কারো পৌষ মাস।
আরো পড়ুন- শায়েস্তাগঞ্জ পৌর জাসাসের আহ্বায়ক হলেন হাফিজ আল মিথুন
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ মামুন চৌধুরী, বার্তা সম্পাদক: ইসলাম উদ্দিন