তার চাওয়া খুব সামান্য-একটু নিরাপদ জীবন

তার চাওয়া খুব সামান্য-একটু নিরাপদ জীবন

মো. মামুন চৌধুরী॥ বয়স প্রায় ৯০ বছর। জীবনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আজ তিনি দাঁড়িয়ে আছেন বার্ধক্যের শেষ প্রান্তে। শরীর আর আগের মতো সাড়া দেয় না। হাঁটতে কষ্ট হয়, শক্তি কমে গেছে। তবুও থেমে নেই পথচলা। কারণ থেমে গেলে হয়তো জুটবে না একবেলার খাবার।

কখনো শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে জংশনের প্লাটফর্মে, কখনো মানুষের দ্বারে-হাতে একটি ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে ঘুরে বেড়ান সাফিয়া বেগম। চোখে বয়সের ছাপ, মুখে ক্লান্তির রেখা, পরনে জীর্ণ কাপড়। জীবনের শেষ বয়সে এসে তার সবচেয়ে বড় সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে অভাব আর অসহায়ত্ব।

সাফিয়া বেগমের বাড়ি হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার ধানি মহল্লায়। স্বামী নেই। একমাত্র ছেলে থাকলেও তার কাছে নেই। ছেলেটি ভবঘুরে জীবনযাপন করেন, নানান জায়গায় ঘুরে বেড়ান। ফলে মায়ের খোঁজ নেওয়া বা নিয়মিত দেখাশোনা করার মতো অবস্থায় নেই সে।

এখন মেয়ের কাছেই থাকেন বৃদ্ধা। কিন্তু মেয়ের সংসারেও অভাব। নিজেদের সংসার চালাতেই যখন হিমশিম খেতে হয়, তখন বৃদ্ধা মায়ের খাবার ও প্রয়োজন মেটানোও কঠিন হয়ে পড়ে। আর সেই বাস্তবতাই ৯০ বছর বয়সী সাফিয়াকে আবারও মানুষের কাছে হাত পাততে বাধ্য করেছে। সম্প্রতি শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে জংশনে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় তার। জীবনের গল্প বলতে গিয়ে একপর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাফিয়া বেগম বলেন, “ছেলে থেকেও নেই। সে এক জায়গায় থাকে না, নানান জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। আমার দেখাশোনা করার কেউ নেই। তাই মেয়ের কাছে থাকি। কিন্তু মেয়ের সংসারেও অনেক অভাব। তারা নিজেরাই ঠিকমতো চলতে পারে না। আমি তাদের ওপর বোঝা হয়ে থাকতে চাই না। তাই শরীর না চললেও ভিক্ষা করতে বের হই।” কথাগুলো বলার সময় তার কণ্ঠ বারবার ভারী হয়ে আসছিল। যেন প্রতিটি শব্দের সঙ্গে বেরিয়ে আসছিল বছরের পর বছর জমে থাকা কষ্ট।

তিনি জানান, অনেক সময় বিভিন্ন মাজারে চলে যান। নামাজ পড়েন, তজবি পড়েন। কেউ দয়া করে কিছু টাকা দিলে তা দিয়ে খাবারের ব্যবস্থা করেন। কখনো খাবার জোটে, কখনো জোটে না। তবুও জীবন থেমে থাকে না। বৃদ্ধার পরনের কাপড়টির দিকেও চোখ আটকে যায়। পুরোনো ও ছেঁড়া কাপড়টি যেন তার অসহায় জীবনেরই নীরব সাক্ষী।

সাফিয়া বেগম বলেন, “গায়ের কাপড় ছিঁড়ে গেছে। টাকা নেই, নতুন কাপড় কিনতে পারি না। কেউ একটা নতুন কাপড়ও দেয় না। আমার আর কী চাওয়া আছে? একটা কাপড় আর দুবেলা খাবার হলেই হয়।”
একটু থেমে আবার বলেন, “বয়স হয়ে গেছে। শরীর চলে না। কিন্তু অভাব তো বয়স বোঝে না। পেট তো খাবার চায়।” তার এই একটি কথাতেই যেন ফুটে ওঠে পুরো জীবনের বাস্তবতা।
৯০ বছরের এই বৃদ্ধা জানান, সরকারি ভাতার একটি কার্ড পাওয়ার জন্য বহুবার চেষ্টা করেছেন। বিভিন্নজনের কাছে গিয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা হয়নি।
তার আকুতি, “একটা সরকারি ভাতার কার্ড যদি পাইতাম, তাহলে অনেক উপকার হতো। অন্তত প্রতিমাসে কিছু টাকা পেতাম। মানুষের কাছে এভাবে হাত পাততে হতো না।”

সাফিয়া বেগমের জীবনের গল্প শুধু একজন বৃদ্ধার দুঃখের গল্প নয়; এটি আমাদের সমাজের এমন এক বাস্তবতার চিত্র, যেখানে বয়সের ভারে নুয়ে পড়া মানুষটিও অভাবের কাছে পরাজিত হয়ে রাস্তায় নামতে বাধ্য হন।

যে বয়সে একজন বৃদ্ধার পাশে থাকার কথা সন্তানের, যে বয়সে তার হাতে থাকার কথা ওষুধ কিংবা তসবিহ-সেই বয়সে তার হাতে উঠেছে ভিক্ষার ঝুলি। যে বয়সে একটু শান্তি ও নিরাপত্তা পাওয়ার কথা, সেই বয়সে প্রতিদিন তাকে খুঁজতে হচ্ছে মানুষের করুণা।

শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে জংশনের কোলাহলের মাঝে সাফিয়া বেগমের মতো একজন বৃদ্ধার অসহায় বসে থাকা হয়তো অনেকের চোখেই সাধারণ দৃশ্য। কিন্তু তার পেছনে লুকিয়ে আছে প্রায় ৯০ বছরের একটি জীবন, হারিয়ে যাওয়া স্বামী, দূরে সরে যাওয়া সন্তান এবং অভাবের সঙ্গে প্রতিদিনের লড়াই।

সাফিয়া বেগমের এখন আর বড় কোনো স্বপ্ন নেই। নেই বাড়ি-গাড়ির চাওয়া। নেই জমিজমার আকাক্সক্ষা। তার চাওয়া খুব সামান্য-একটু নিরাপদ জীবন, পরনের একটি ভালো কাপড়, দুবেলা খাবার এবং সরকারি একটি ভাতার কার্ড।

সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি তার পাশে দাঁড়ায়, তাহলে হয়তো জীবনের শেষ দিনগুলোতে আর ভিক্ষার ঝুলি হাতে রাস্তায় ঘুরতে হবে না ৯০ বছরের সাফিয়া বেগমকে। হয়তো তখন তার কাঁপা হাতে ভিক্ষার ঝুলির বদলে থাকবে একটি ভাতার কার্ড। আর চোখের পানির বদলে ফুটে উঠবে একটু স্বস্তির হাসি।

আরও পড়ুন- মানবিক কাজের স্বীকৃতি পেলেন এএসআই শাহজালাল

Tagged:

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নামাজের সময়সূচি
বর্তমান সময়
লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...
পরবর্তী নামাজ: লোড...
ফজর --:--
যোহর --:--
আসর --:--
মাগরিব --:--
ইশা --:--
সময় গণনা হচ্ছে...