হবিগঞ্জ প্রতিনিধি॥ বর্ষার মেঘ, চারদিকে থইথই পানি, হাওরের বুকে ছুটে চলা নৌকা আর ভাটিয়ালি-বাউলের সুর-প্রকৃতি ও লোকজ সংস্কৃতির এমন অপূর্ব মেলবন্ধনে হাওরের বুকে অনুষ্ঠিত হলো শব্দকথা হাওর বিলাস ২০২৬। ভাটির জনপদের জীবন, প্রকৃতি, সাহিত্য ও আবহমান বাংলার লোকজ ঐতিহ্যকে ধারণ করে টানা তৃতীয়বারের মতো আয়োজন করা হয় ব্যতিক্রমধর্মী এই অনুষ্ঠান।
শব্দকথা সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিষদের আয়োজনে এবারের আয়োজনের প্রতিপাদ্য ছিল ‘ভাটির সুরে, বর্ষার ছন্দে: বর্ষাবরণ ১৪৩৩’। রোববার দিনব্যাপী এ আয়োজনে হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ, নিকলী ও মিঠামইন উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওরজুড়ে একত্রিত হন দেড় শতাধিক প্রকৃতিপ্রেমী, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিসেবী, সংগীতশিল্পী ও ভ্রমণপিপাসু মানুষ।
হাওরের জলরাশি আর বর্ষার নৈসর্গিক সৌন্দর্যের মাঝে নৌকায় নৌকায় ছড়িয়ে পড়ে গান, কবিতা ও লোকসংস্কৃতির আবহ। কখনো ভাটিয়ালির সুর, কখনো বাউলগান, আবার কখনো কবিতার ছন্দ-সব মিলিয়ে হাওরের বুকে সৃষ্টি হয় এক অনন্য সাংস্কৃতিক পরিবেশ।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শব্দকথা সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, প্রেম ও দ্রোহের কবি মনসুর আহমেদ। সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সদস্য সচিব আখতারুজ্জামান তরফদার জামান। স্বাগত বক্তব্য দেন শব্দকথা হাওর বিলাস উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক হেলাল আহমেদ। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সদস্য সচিব হাবিব খোকন।
অনুষ্ঠানে অনুভূতি প্রকাশ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী মমিন, সংগীতজ্ঞ স্বদেশ দাস, হবিগঞ্জ বারের সিনিয়র আইনজীবী জুনায়েদ মিয়া, সংগীতশিল্পী গোপী মোহন দাস, পুটিজুরী শরৎচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক পঙ্কজ কান্তি গোপ, শিক্ষক মো. আব্দুল মালিক, আলমগীর হোসেন চৌধুরী, নাট্যভাষ্করের সভাপতি সাইফুর রহমান চৌধুরী পাপলু, প্রকৌশলী আশরাফুল আলাম, চিকিৎসক মো. আব্দুল আহাদ, অগ্রগামী গণপাঠাগারের সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান, সংগঠক এনি মনি দাস এবং নারী উদ্যোক্তা এস. কে. নাহারসহ বিশিষ্টজনেরা।
আয়োজনের ‘বর্ষার বুকে কাব্যযাত্রা’ পর্বে কবিতা আবৃত্তি করেন সৈয়দা বেলী, ইসরাত জাহান ফাল্গুনী ও প্রকৃতি দাস। আর ‘লোকসুরে নৌযাত্রা’ পর্বে গান পরিবেশন করেন সিরাজ বাউল, নুরুন্নাহার শিমুল, মো. দুলাল, জগৎ সরকার, হৃদয় বৈষ্ণব, সৌরভ দাস, চৌধুরী তাওহীদ বিন আজাদ, পুলক দাস ও দ্বীপ সরকার। দিনব্যাপী আয়োজনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব ছিল হাওরের বুকে নৌকায় বসে ভাটিয়ালি, বাউল ও লোকসংগীতের পরিবেশনা। চারপাশের জলরাশি, বর্ষার আকাশ, বাতাসের দোলা আর শিল্পীদের কণ্ঠে ভাটির গান—সব মিলিয়ে যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে বাংলার চিরচেনা হাওরজীবন।
আয়োজনে অংশ নেওয়া সাহিত্য ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা বলেন, শহুরে জীবনের ব্যস্ততার বাইরে এসে হাওরের প্রকৃতির সঙ্গে এমনভাবে একাত্ম হওয়ার সুযোগ শুধু বিনোদন নয়, এটি বাংলার শেকড় ও লোকঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হওয়ারও একটি অনন্য মাধ্যম।

আয়োজকরা জানান, হাওরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ভাটির জনপদের জীবনধারা এবং বাংলার সমৃদ্ধ লোকজ সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরাই ‘শব্দকথা হাওর বিলাস’ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। সাহিত্য, সংগীত ও প্রকৃতির সমন্বয়ে এই আয়োজন ভবিষ্যতেও নিয়মিতভাবে অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তারা।
তাদের মতে, হাওর শুধু জলরাশির বিস্তীর্ণ প্রান্তর নয়-এটি মানুষের জীবন, সংগ্রাম, ভালোবাসা, গান, কবিতা ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত পাঠশালা। আর সেই পাঠশালাতেই বর্ষার দিনে ‘শব্দকথা হাওর বিলাস’ হয়ে উঠেছে ভাটির সংস্কৃতির এক প্রাণের উৎসব।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ মামুন চৌধুরী, বার্তা সম্পাদক: ইসলাম উদ্দিন