মো. মামুন চৌধুরী ॥ হাওর, পাহাড়, গ্রাম-শহর ও শিল্পাঞ্চলের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা হবিগঞ্জ জেলা-এর বিস্তীর্ণ জনপদ আজ যেন এক গভীর দুঃখগাঁথার নাম।
যে হাওরাঞ্চল কিছুদিন আগেও সোনালি ধানের হাসিতে ভরে উঠেছিল, সেখানে এখন শুধু পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া স্বপ্ন আর কৃষকের বুকভাঙা কান্না।
জেলার আজমিরীগঞ্জ, বানিয়াচং, লাখাই, নবীগঞ্জ ও বাহুবলসহ পাঁচটি উপজেলার বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত হাওরাঞ্চলই মূলত জেলার খাদ্যভান্ডার। চলতি বোরো মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ করা হয়।

লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের, যা থেকে প্রায় ৫ লাখ ২৯ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের আশা ছিল।
সম্ভাব্য বাজারমূল্য ধরা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৩৮৩ কোটি ২০ লাখ টাকা- যা এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখার কথা ছিল।
মাঠজুড়ে যখন সোনালি ধানের ঢেউ, তখন কৃষকের চোখে ছিল স্বস্তির হাসি। ঋণ, কষ্ট আর দীর্ঘ অপেক্ষার পর এ যেন ছিল ঘুরে দাঁড়ানোর সময়। কিন্তু প্রকৃতির নির্মম পরিহাসে সেই স্বপ্নই আজ ভেঙে চুরমার।
টানা বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হাওরের পর হাওর প্লাবিত হয়ে পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে।
আজমিরীগঞ্জের কৃষক কাজল মিয়া চোখে পানি নিয়ে বলেন, ঋণ করে তিনি বোরো ধান আবাদ করেছিলেন।
ফলনও হয়েছিল আশানুরূপ। কিন্তু কয়েকদিনের বৃষ্টিতে সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। এখন তিনি পরিবার নিয়ে দিশেহারা। সংসার চালানোই হয়ে উঠেছে বড় চ্যালেঞ্জ।
সরকারের জরুরি সহায়তা ছাড়া সামনে কী হবে, তা তিনি ভাবতেই পারছেন না। একই চিত্র দেখা যাচ্ছে লাখাই, বাহুবল, নবীগঞ্জ ও বানিয়াচংয়ের হাওরগুলোতে।
লাখাইয়ের সজিব মিয়া, বাহুবলের সুমন মিয়া, নবীগঞ্জের বশির মিয়া ও বানিয়াচংয়ের কায়েছ মিয়াসহ শত শত কৃষক জানিয়েছেন, তাদের অধিকাংশ জমির ধান ইতোমধ্যেই পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
অনেকেই এখনও ধান কাটার সুযোগ পাননি। ফলে ক্ষতির পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ারুল হক জানান, ভারী বর্ষণের কারণে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে।
এখনও প্রায় ৪৮ শতাংশ ধান কাটা বাকি রয়েছে। বৃষ্টি ও পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তবে কৃষি বিভাগের মাঠকর্মীরা কৃষকদের পাশে থেকে সার্বক্ষণিক সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ছায়েদুর রহমান জানান, বৃষ্টিপাত কিছুটা কমতে শুরু করেছে। কালনী-কুশিয়ারা নদীর পানি এখনও বিপদসীমার ১২০ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বাঁধগুলো নিয়মিত পরিদর্শন করা হচ্ছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
তবে বাস্তবতা হলো-হাওরের কৃষকের জন্য সময় খুবই সংকটময়। প্রতিটি দিন, প্রতিটি ঘণ্টা যেন নতুন করে ক্ষতির আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। যাদের সারা বছরের জীবিকা নির্ভর করে এই বোরো ফসলের ওপর, তারা আজ অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে।
এ পরিস্থিতিতে দ্রুত ধান রক্ষা, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসন এবং জরুরি প্রণোদনা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। নইলে শুধু ফসলই নয়, ভেঙে পড়বে শত শত কৃষক পরিবারের জীবনযাত্রার ভিত্তি।
আরো পড়ুন- হবিগঞ্জে ৩ ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ মামুন চৌধুরী, বার্তা সম্পাদক: ইসলাম উদ্দিন