মো. মামুন চৌধুরী ॥ ১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর। ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি হয়তো আর দশটি দিনের মতোই। কিন্তু হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার হাওরবেষ্টিত কৃষ্ণপুর গ্রামের মানুষের কাছে এটি এক ভয়াল স্মৃতির নাম। দিনটি এলেই ফিরে আসে ৫৫ বছর আগের সেই রক্তাক্ত সকাল। ফিরে আসে স্বজন হারানোর কান্না, আতঙ্কে পালিয়ে বেড়ানোর স্মৃতি আর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞের দৃশ্য।
বলভদ্র নদীর পাড়ের প্রত্যন্ত কৃষ্ণপুর সেদিন পরিণত হয়েছিল মৃত্যুপুরীতে। ভোরের আলো ফোটার আগেই স্থানীয় রাজাকার বাহিনীর কমান্ডার ও কয়েকজন আলবদর সদস্যের সহযোগিতায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ১০ থেকে ১২ জন সদস্য অষ্টগ্রাম ক্যাম্প থেকে স্পিডবোটে করে কৃষ্ণপুরে প্রবেশ করে। মুহূর্তেই তারা ঘিরে ফেলে গ্রামের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা।
গদাইনগর, চন্ডিপুর, লালচান্দপুর, গকুলনগর, গঙ্গানগর, সিতারামপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয় তল্লাশি। ঘুমন্ত মানুষকে টেনে-হিঁচড়ে ঘর থেকে বের করে আনা হয়। আতঙ্কে কেউ কচুরিপানার আড়ালে, কেউ ঘরের গোপন জায়গায়, আবার কেউ ঝোপঝাড়ের মধ্যে লুকিয়ে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু সেদিন অনেকের ভাগ্যে বাঁচার সুযোগটুকুও জোটেনি।
হানাদাররা নিরীহ গ্রামবাসীদের ধরে এনে কৃষ্ণপুর গ্রামের ননী গোপাল রায়ের বাড়ির পুকুরঘাটসংলগ্ন পাকা জায়গা, গদাইনগরের চিত্তরঞ্জন দাশের বাড়ির উঠান এবং চন্ডিপুরের তিনটি স্থানে জড়ো করে। সকাল গড়িয়ে দুপুর। একসময় ব্রাশফায়ারের শব্দে কেঁপে ওঠে কৃষ্ণপুরের বাতাস। মুহূর্তেই লুটিয়ে পড়তে থাকেন নিরস্ত্র মানুষ।
স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেদিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গুলিতে নিহত ৪৭ জনের নাম পাওয়া গেছে। তারা হলেন-কালী দাস রায়, ডা. ননী রায়, রাধিকা মোহন রায়, গোপী মোহন সূত্রধর, সুনীল শর্মা, মুকুন্দ সূত্রধর, যোগেন্দ্র সূত্রধর, মহেন্দ্র রায়, অনিল মাঝি, চন্দ্র কুমার রায়, জয় কুমার রায়, শান্ত রায়, কিশোর রায়, ননী চক্রবর্তী, সুনিল চক্রবর্তী, ব্রজেন্দ্র দাস, জগদীশ দাস, ইশান দাস, ধীরেন্দ্র রায়, হরিচরণ রায়, মদন রায়, দাশু শুক্লবৈদ্য, হরি দাশ রায়, শব লঞ্জন রায়, রামাচরণ রায়, ডা. অবিনাশ রায়, শৈলেস রায়, ক্ষিতিশ গোপ, নীতিশ গোপ, হীরা লাল গোপ, প্যারি দাস, সুভাষ সূত্রধর, প্রমোদ দাস, সুদর্শন দাস, গোপাল রায়, দীগেন্দ্র আচার্য্য, রেবতী রায়, শুকদেব দাস, দীনেশ বিশ্বাস, মনোরঞ্জন বিশ্বাস, রস রাজ দাস, জয় গোবিন্দ্র দাস, বিশ্বনাথ দাস, মহাদেব দাশ, মহেশ দাস, শবরঞ্জন রায় ও মনোরঞ্জন বিশ্বাস।
এছাড়াও বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষ্ণপুরে আশ্রয় নেওয়া আরও বহু নিরীহ মানুষ হত্যার শিকার হন। স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, সেদিন সবমিলিয়ে ১২৭ জন প্রাণ হারান।
হত্যাযজ্ঞের পর বলভদ্র নদীর পাড় ও আশপাশের হাওর যেন পরিণত হয় মরদেহের স্তুপে। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে লাশের গন্ধ। চারদিকে শুধু কান্না আর আহাজারি। হত্যার পাশাপাশি চলে লুটপাট ও নারীদের ওপর নির্যাতনের মতো বর্বরতাও। সেদিনের ভয়াল ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন চন্ডিপুর পাড়ার বাসিন্দা গোপাল চন্দ্র রায়ের ছেলে গোপেন চন্দ্র রায়। ১৯৭১ সালে তার বয়স ছিল মাত্র সাত বছর। শিশু বয়সে দেখা সেই দৃশ্য আজও তার স্মৃতিতে অমলিন। তার চোখের সামনেই নিরীহ মানুষদের রশি দিয়ে বেঁধে গুলি করে হত্যা করা হয়। ভয় আর আতঙ্কে তিনি নিশ্চুপ হয়ে দেখেছিলেন মানুষের জীবন নিভে যাওয়ার সেই দৃশ্য।
ভাগ্যের জোরে সেদিন হানাদারদের ব্রাশফায়ার থেকে বেঁচে যান গদাইনগরের দীনবন্ধু, পরিতোষ রায়সহ আরও অনেকে। তবে চন্ডিপুর পাড়ার ওপর নেমে এসেছিল আরও ভয়াবহ বিপর্যয়। স্থানীয়দের ভাষায়, ওই পাড়ার প্রায় কোনো পরিবারই সেদিনের হত্যাযজ্ঞের ছোবল থেকে রক্ষা পায়নি।
চন্ডিপুর পাড়ার আরেক প্রত্যক্ষদর্শী জয় কুমার রায়ের ছেলে বেনুপদ রায়। ১৯৭১ সালে তার বয়স ছিল মাত্র ১১ বছর। শিশু বয়সেই তাকে দেখতে হয়েছিল বাবাকে হারানোর নির্মম দৃশ্য।
বেনুপদ রায়ের বর্ণনা অনুযায়ী, সেদিন পাকিস্তানি সেনাদের পাশাপাশি রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর সদস্যরাও হত্যাযজ্ঞে অংশ নেয়। তার বাবা জয় কুমার রায়, চাচা চন্দ্র কুমার রায়সহ পরিবারের সাতজন আত্মীয়কে সেদিন নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। হত্যার পর মরদেহ পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি জানান। ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই স্মৃতি তার কাছে যেন গতকালের ঘটনা। স্বজনদের হারানোর সেই ক্ষত আজও শুকায়নি।
সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলে গেছে। বদলে গেছে মানুষের জীবন, বদলে গেছে গ্রামের চেহারা। কিন্তু কৃষ্ণপুরের মাটি এখনো বহন করছে একাত্তরের সেই রক্তাক্ত ইতিহাস। সরেজমিনে হত্যাকান্ড সংঘটিত এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ননী গোপাল রায়ের বাড়ির টয়লেটের দেয়ালে এখনো রয়েছে গুলির চিহ্ন। বাড়ির পাশের দুর্গা মন্দিরের দেয়ালেও দৃশ্যমান সেই গুলির ক্ষত।
নীরব দেয়ালগুলো যেন আজও বলে যায়-এখানে একদিন মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। এখানে একদিন মায়ের বুক খালি হয়েছিল, সন্তানের মাথার ওপর থেকে বাবার ছায়া সরে গিয়েছিল, স্বামী হারিয়েছিলেন স্ত্রী, ভাই হারিয়েছিলেন ভাইকে। গুলির ক্ষতগুলো কেবল ইট-পাথরের দেয়ালের ক্ষত নয়; এগুলো একটি গ্রামের বুকের ক্ষত, একটি প্রজন্মের বয়ে চলা যন্ত্রণা।
স্বাধীনতার এত বছর পরও কৃষ্ণপুরের স্বজনহারাদের কণ্ঠে একই দাবি-তারা চান এই হত্যাযজ্ঞের ইতিহাস যথাযথভাবে সংরক্ষিত হোক। নতুন প্রজন্ম জানুক, একাত্তরে কী ঘটেছিল এই প্রত্যন্ত জনপদে।
স্বজনদের অনেকেই কথা বলতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেন না। চোখের সামনে ভেসে ওঠে হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনদের মুখ। কান্নায় ভারী হয়ে আসে কণ্ঠ।
তাদের দাবি, কৃষ্ণপুরের গণহত্যার স্থানগুলো চিহ্নিত করে সংরক্ষণ করা হোক। গুলির ক্ষতচিহ্নগুলো রক্ষা করা হোক। নির্মাণকাজ বা অবহেলায় যেন একাত্তরের এই সাক্ষ্যগুলো হারিয়ে না যায়।
কারণ ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় থাকে না। ইতিহাস থাকে মানুষের স্মৃতিতে, মাটিতে, দেয়ালের গুলির দাগে, নদীর জলে এবং স্বজন হারানো মানুষের চোখের জলে।
১৮ সেপ্টেম্বর তাই কৃষ্ণপুরের কাছে শুধুই একটি তারিখ নয়-এটি ১২৭টি প্রাণের স্মরণ, অসংখ্য পরিবারের কান্না এবং একাত্তরের নির্মমতার জীবন্ত সাক্ষ্য।
বলভদ্র নদী আজও বয়ে চলে। হাওরে আবার সবুজ ধান দোলে। কৃষ্ণপুরের মানুষও জীবনের প্রয়োজনে সামনে এগিয়ে গেছে। কিন্তু ১৮ সেপ্টেম্বর এলেই সেই শান্ত গ্রামের বুকের ভেতর যেন আবারও বাজতে থাকে ব্রাশফায়ারের শব্দ। আর নীরব দেয়ালের গুলির ক্ষত মনে করিয়ে দেয়- কিছু ইতিহাস কখনো পুরোনো হয় না, কিছু ক্ষত কোনোদিন শুকায় না।
আরও পড়ুন- জমি নিয়ে বিরোধে যুবককে কুপিয়ে হত্যার
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ মামুন চৌধুরী, বার্তা সম্পাদক: ইসলাম উদ্দিন